Murshidabad
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (CAA) বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়ে ব্যাপক হিংসা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল মুর্শিদাবাদ জেলার নানা প্রান্তে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের ওই বিক্ষোভের জেরে লালগোলা ও বেলডাঙা স্টেশন-সহ বেশ কিছু এলাকায় রেলের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিক্ষোভকারীদের একটি দল বেলডাঙা স্টেশনে হামলা চালিয়েছিল। স্টেশন মাস্টারের কেবিন এবং টিকিট কাউন্টারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া ও ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তার দুই দিনের মধ্যে আন্দোলন আরও চরম আকার নেয়। ১৫ ডিসেম্বর কৃষ্ণপুর স্টেশন এবং লালগোলা স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেনে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। লালগোলা স্টেশনেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় সেই সময়ে শিয়ালদহ-লালগোলা রুটে দীর্ঘ দিন ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয় এবং যাত্রীদের ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
সেই সময়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনায় একাধিক মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ এবং দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল বেশ কয়েক জনকে। ওই ঘটনার সাত বছর পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফের বিহার ও ঝাড়খণ্ডে দুইজন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখানোর সময়ে বিক্ষোভকারীরা ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে। তার জেরে ওই রুটে বাতিল করতে হয় বেশ কয়েক জোড়া ট্রেন। এই ঘটনাগুলি ফের প্রশাসনের রাডারে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শনিবার এক বৈঠকে রেলের সম্পত্তিহানির ঘটনাগুলোর নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্য পুলিশের ডিজিপি-কে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ আদায় করার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার রাজ্যে এসেছিলেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। রেলমন্ত্রীর উপস্থিতিতে রেলের উন্নয়ন সংক্রান্ত বৈঠক হয়।
ওই বৈঠকে রেলের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ, যেগুলি আটকে ছিল সেগুলি যাতে দ্রুত সম্পন্ন করা যায় তা নিয়ে বৈঠক ছিল। ওই বৈঠকে রেলমন্ত্রী ছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রী, বিধায়ক ও আধিকারিকরা ছিলেন। ওই বৈঠকে হাজির ছিলেন মুর্শিদাবাদের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। তিনি বলেন, ‘কলকাতাতে এ দিনের বৈঠকে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সামনে বক্তব্য রাখার সুযোগ হয়েছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার রেলের উন্নয়ন নিয়ে আমি বলছিলাম, সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রস্তাব দেন, শুধু মুর্শিদাবাদ জেলায় উন্নয়ন করলেই হবে না, মুর্শিদাবাদ জেলায় বারবার রেলের সম্পত্তি ধ্বংস করা হচ্ছে। বার বার যাঁরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তাঁদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আগামী ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটাতে পারে। এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ আদায় করার কথা বৈঠকে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকি গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখে রাজ্য পুলিশের ডিজিপিকেও এ সংক্রান্ত নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।’
তাঁর সংযোজন, ‘২০১৯ সালে সিএএ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে সারা মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ১০টি স্টেশন ও পাঁচটি ট্রেন বিক্ষোভকারীরা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন ও পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশ মন্ত্রী তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করেননি। তিন মাস মুর্শিদাবাদের মানুষ রেল যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশকে সমর্থন জানিয়ে এ প্রসঙ্গে বিধানসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতক মহম্মদ আখরুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হোক, এটা কারও কাম্য হতে পারে না। আন্দোলন আন্দোলনের মতো হবে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় গড়ে তোলা সরকারি সম্পত্তি আন্দোলনের নামে ভাঙচুর চালানো বা অগ্নিসংযোগ ঘটানো সমর্থন করি না। আমাদের সরকারও এ ক্ষেত্রে কড়া অবস্থান নিয়েছিল।’ বেলডাঙার বিধায়ক বিজেপির ভরত ঝাওর বলেন, ‘জনজীবন বিপর্যস্ত করে সিএএ আন্দোলনের নামে রেলের সম্পত্তি ভাঙচুর করেছিল কিছু দুর্বৃত্ত। ওই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল বেলডাঙা থেকে। বেলডাঙা স্টেশনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছিল সেই সময়ে। রেলগেটের উপরে উঠে গুলি ছুঁড়তে দেখেছি। বেলডাঙা বাজার এলাকায় একের পর পর এক দোকানে ভাঙচুর ও রাস্তার আলো লাঠি মেরে ভেঙে দিতে দেখেছি।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি তখন তৃণমূলের বেলডাঙার পুরপ্রধান। পরে বিকেলের দিকে হিন্দু-মুসলিম এলাকার মানুষ এক সঙ্গে রাস্তায় নামলে ওই দুর্বৃত্তরা পিছু হঠে। আমি ওই দুর্বৃত্তদের নাম পুলিশের কাছে জমা দিই। কিন্তু পুলিশ কিছু করেনি। সেই সময়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিল কয়েক জন। কিন্তু তাঁদের এখনও শাস্তি হয়নি।’