পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো ছায়া। একের পর এক বিস্ফোরণ, টানা সাইরেন, আকাশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টা—সব মিলিয়ে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা অঞ্চলে। সূত্রের খবর, ইরান পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা একাধিক মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে বড় মাপের হামলা চালিয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, বাহরিন, জর্ডন, কুয়েত-সহ কয়েকটি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি ছিল ইরানের নিশানায়।
ইরাকি সংবাদমাধ্যমের দাবি, বাহরিনে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, সেখানে ১৬টিরও বেশি বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া যায়। একইসঙ্গে জর্ডনেও হামলার খবর সামনে এসেছে। বাহরিন, জর্ডন এবং কুয়েতের মতো দেশগুলিতে বারবার যুদ্ধ সাইরেন বাজানো হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলেও খবর।
ইরানের ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কোর, অর্থাৎ আইআরজিসি দাবি করেছে, তাদের অ্যারোস্পেস বাহিনী জর্ডনের একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে দূরপাল্লার সলিড-ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তাদের দাবি, মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টারকে নিশানা করে এই হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি এই অভিযানকে মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে অন্যতম বড় প্রতিশোধমূলক হামলা হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, পশ্চিম এশিয়া জুড়ে অন্তত ২১টি মার্কিন ঘাঁটি ছিল এই হামলার লক্ষ্য।
কুয়েতের তরফেও হামলার কথা জানানো হয়েছে। তবে তাদের দাবি, ইরান থেকে ছোড়া বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। বাহরিনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার যুদ্ধ সাইরেন বাজানো হয়েছে। নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জর্ডনের সশস্ত্র বাহিনীর দাবি, আল আজরাক এলাকার দিকে ধেয়ে আসা পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ভূপাতিত করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ জর্ডনের মাটিতে পড়লেও বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর নেই বলে জানানো হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি যে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে, তা স্পষ্ট।
এর মধ্যেই নতুন উত্তেজনা ছড়িয়েছে লেবাননেও। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লা জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক ঘাঁটি, সাঁজোয়া গাড়ি এবং কমান্ড পোস্ট লক্ষ্য করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা চালিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবাননের কয়েকটি এলাকায় ইজরায়েলি ঘাঁটিকে নিশানা করা হয়েছে। ফলে ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার পাশাপাশি ইজরায়েল-হিজবুল্লা সংঘাতও নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে আরও একটি বড় ঘটনা। মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন সেনার একটি অ্যাপাচে হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরান ওই হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। এরপরই আমেরিকা পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে বলে জানা যায়। মার্কিন সূত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালীর আশপাশে থাকা ইরানের কয়েকটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। ইরানের উপর তিন দফায় হামলা চালানোর পরই তেহরান স্পষ্ট বার্তা দেয়, তারা মার্কিন আক্রমণের কঠোর জবাব দেবে।
আর সেই জবাব হিসেবেই পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করছে ইরান। আমেরিকার পঞ্চম নৌবহরও ইরানের হামলার নিশানায় ছিল বলে সূত্রের দাবি। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা গোটা অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সংঘাত এখানেই থামবে, নাকি আরও বড় সামরিক মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোবে পশ্চিম এশিয়া? ইরান যদি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে থাকে এবং আমেরিকা তার পাল্টা জবাব দেয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজার, তেলের দাম এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এই মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়ার প্রতিটি সামরিক ঘাঁটি, প্রতিটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রতিটি কূটনৈতিক বার্তার দিকে নজর রাখছে গোটা বিশ্ব। কারণ একটি ভুল পদক্ষেপই পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইরান, আমেরিকা, ইজরায়েল এবং তাদের মিত্রশক্তির পরবর্তী সিদ্ধান্তই ঠিক করবে, পশ্চিম এশিয়া কি আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতের দিকে এগোবে, নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনীতির পথে ফিরবে।