Abhishek Banerjee
জাতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় তৃণমূল এবং শিব সেনার উদ্ধব শিবিরে ভাঙন। প্রায় একই ধাঁচে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং উদ্ধব ঠাকরের দলকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছে শাসক শিবির। এবং কাকতালীয়ভাবে হলেও দুই ভাঙনের নেপথ্যেই ‘ভিলেন’ হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে দলের তরুণ প্রজন্মকে। তৃণমূলে সেই ‘ভিলেনে’র নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর শিব সেনার উদ্ধব শিবিরের ‘খলনায়ক’ আদিত্য ঠাকরে। সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য, নতুন প্রজন্মের হাতে দলের রাশ চলে যাওয়ায় উপযুক্ত সম্মান পাচ্ছেন তা তাঁরা।
আর ‘স্নেহান্ধ’ বাবা বা পিসি সব দেখেও ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকায়! বস্তুত আদিত্য ঠাকরে এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের গল্পটা একই রকম। অভিষেক তৃণমূলে আসেন তাঁর পিসি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর। মমতা ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূলের যুব সংগঠন থাকা সত্ত্বেও অভিষেকের জন্য ‘যুবা’ নামের সমান্তরাল সংগঠন তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই শুরু। তারপর ২০১৪-য় সোমেন মিত্রর ছেড়ে যাওয়া ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ হন তিনি। শুভেন্দু অধিকারী, সৌমিত্র খাঁ-র পর দলের যুব সভাপতি হন অভিষেক। ‘উত্তরাধিকারী’র উপর ক্রমেই ভরসা বাড়ে দলনেত্রীর। ধীরে ধীরে মমতার ‘কিচেন ক্যাবিনেট’কে ব্রাত্য করে অভিষেকেরই উত্তরণ শুরু হয়। মুকুল রায়, শোভন চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম-সহ মুখ্যমন্ত্রীর ‘ভরসাস্থলে’ ধাক্কা দিয়ে ক্রমেই দলের ‘সেনাপতি’ হয়ে ওঠেন।
আদিরা দলের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন। কেউ দল ছাড়েন, কেউ থাকলেও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ গুরুত্ব পাওয়ার জন্য কালীঘাট ছেড়ে ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে পা বাড়ান। একটা সময় দলে অবিসংবাদী দু’নম্বর হয়ে ওঠেন অভিষেক। সর্বস্তরে ‘নিজের লোক’ বসাতে শুরু করেন ‘নম্বর টু’। প্রথমে সাংগঠনিক, তারপর বিভিন্ন শাখা সংগঠনে অভিষেকপন্থীদের প্রভাব বাড়ে। তারপর অভিষেকের পরামর্শে আই প্যাকের আগমন। পরবর্তীতে গোটা সংগঠনটাই কার্যত হাইজ্যাক করে নেয় ওই ভোটকুশলী সংস্থা। অভিষেকের মতো শিব সেনায় আদিত্যের উত্থানও ধূমকেতুর মতো। ২০১০ সালেই বাবা উদ্ধবের হাত ধরে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেন আদিত্য। আর শুরুতেই দলের যুব সংগঠনের দায়িত্ব পান তিনি। সেসময় আদিত্যর বয়স মাত্র বছর কুড়ি।
কোনও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া সোজা দলের যুব সংগঠনের মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়। এর সাত বছরের মাথায় মুম্বই জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন আদিত্য। ২০১৮ সালে আদিত্যকে শিব সেনায় ‘নেতা’র মর্যাদা দেন উদ্ধব। এই ‘নেতা’ উপাধি শিব সেনায় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দলের একেবারে নম্বর টু-কেই ওই সম্মানজনক নামে ডাকা হয়। সেসময় দলে বহু প্রবীণ নেতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের উপেক্ষা করে আদিত্যর উত্তরণ ঘটান তাঁর বাবা। ২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে ওরলি থেকে জেতেন আদিত্য।
পরে উদ্ধব মুখ্যমন্ত্রী হলে ছেলেকে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, পর্যটন, উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মতো একাধিক বড় দপ্তরের মন্ত্রী করেন। এরপরই শুরু হয় ভাঙন। শিব সেনার ভাঙনটা শুরু হয় ক্ষমতা হারানোর পরই। প্রথম সদলবলে দল ছেড়ে বেরিয়ে যান একনাথ শিণ্ডে। নিজে আলাদা করে ব্লক গঠন করে পরে সেই ব্লককেই আসল শিব সেনার মর্যাদা আদায় করে দেন। আড়াআড়ি ভেঙে যায় শিব সেনা। উদ্ধবকে শিব সেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নামের আলাদা দল গড়তে হয়। তবে তাতেও পুত্রস্নেহে ভাঁটা পড়েনি। আবারও দলের অন্য নেতাদের ব্রাত্য করে নিজের ছেলের হাতে গোটা সংগঠনের রাশ ছেড়ে রাখেন তিনি। ফলস্বরূপ আবার ভাঙল উদ্ধবের দল। একই ছবি তৃণমূলেও।
শিব সেনার মতোই আড়াআড়ি ভেঙেছে এ রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদলও। লোকসভায় ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ সাংসদ এনসিপিআইতে। রাজ্য বিধানসভাতেও ভাঙন ধরেছে। প্রতিদিন দলের কোনও না কোনও প্রান্তের নেতা অভিষেককে কাঠগড়ায় তুলে পদত্যাগ করছেন। যা পরিস্থিতি তাতে দলটাই হাতে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের অভিষেক এবং উদ্ধব সেনার আদিত্য ঠাকরে, দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ একই রকম। দলের সিনিয়র নেতাদের গুরুত্ব না দেওয়া, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। দলকে অতি কর্পোরেট ধাঁচে পরিচালনা করতে গিয়ে নেতা-কর্মীর মধ্যেকার আত্মিক সম্পর্ককে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কে পরিণত করা। দলে পুরনোদের সরিয়ে নিজের অনুগামীদের বড় পদ দেওয়া এবং দলীয় সংগঠনের পাশাপাশি সমান্তরাল সংগঠন তৈরি করা। দুই নেতার ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা ঔদ্ধত্য এবং দলের নীচুতলার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা এবং সর্বোপরি গোটা সংগঠনের উপর দাদাগিরি দেখানো। চমকপ্রদ বিষয় হল, এত কিছুর পরও নিজেদের উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করেননি মমতা বা উদ্ধব। যার ফল-তাঁদের সাজানো বাগান ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছেন একনাথ শিণ্ডে-ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা।