Abhishek Bandopadhayay’s travel in private jet
প্রাইভেট জেটে চেপে দিল্লি যাতায়াত করছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের আগে পর্যন্ত এটা খুব স্বাভাবিক মনে হলেও, আজকের পরিস্থিতিতে সেই বিমানযাত্রাই এখন প্রশ্নের মুখে দলের অন্দরেই। এমব্রায়ার ইআরজে বিমান। ঘণ্টায় ভাড়া সাত লক্ষ টাকার কাছাকাছি! সেই বিমানে কলকাতা–দিল্লি যাতায়াত করছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন নয়, বহুদিন ধরে। শুক্রবার দুপুরেও ওই বিমানে শহর থেকে দিল্লি গিয়েছেন। ফিরেছেন সন্ধেয়। ১৩ আসনের বিমানে হাতেগোনা দু’তিন জন। যাতায়াতে পাঁচ ঘণ্টার ভাড়া ৩৫ লক্ষ টাকার আশপাশে! সূত্রের দাবি, সেই টাকা খরচ হচ্ছে দলীয় তহবিল থেকেই।
পরিষদীয় দল হোক বা সংসদীয়— দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশই এখন বিদ্রোহী। জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে নেতা থেকে কর্মীরা গ্রেফতার হচ্ছেন। বাকিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই এলাকাছাড়া। দলের তহবিলও হাতে থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয়। নেতা-কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার লোক নেই। ছন্নছাড়া অবস্থা গোটা দলের। আর সেই অবস্থাতেও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের প্রাইভেট জেট চড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ। শুক্রবার লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি গিয়েছেন অভিষেক। আগের মতোই চার্টার্ড বিমানে। আর তা নিয়ে কুণালের বক্তব্য স্পষ্ট, ‘‘উনি চার্টার্ড বিমানে গিয়েছেন কি না জানা নেই। আর যদি গিয়ে থাকেন এবং তা যদি দলের টাকায় হয়, তা হলে তা সমর্থন করি না।’’ যদিও দিল্লিতে কুণালের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করলে অভিষেক এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘যাঁরা এ সব বলছেন, আমি কিসে আসছি, কিসে যাচ্ছি কোথা থেকে নামছি, তাঁরা যদি লিখিত দিয়ে দেন, আমি ইকনমি ক্লাসে যাব। কুণাল ঘোষ আমার সহকর্মী। তিনি আমার বিরুদ্ধে বলতে পারেন, আমি তাঁর বিরুদ্ধে বলব না।’’
শুধু কুণাল নন, নাম না-করে অভিষেককে বিঁধতে ছাড়েননি বিদ্রোহী শিবিরের ‘সেনাপতি’ ঋতব্রত। শুক্রবার বিধানসভায় তাঁর কটাক্ষ, ‘‘আমরা কলকাতা থেকে দিল্লি, চার-পাঁচ কোটি টাকা খরচা করে চাটার্ড ফ্লাইটে যাব না।’’ পাশে পাণ্ডবেশ্বরের প্রাক্তন বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নিয়ে ঋতব্রত নিশানা করেছেন অভিষেকের নেতৃত্বকে, ‘‘দলের শ’য়ে শ’য়ে কর্মী আক্রান্ত। তাঁদের মামলা লড়ার খরচ নেই। বাগনানের কথা জানি। সোনা বন্ধক রেখে কর্মীদের মামলার খরচ মেটাচ্ছেন অরুণাভ সেন।’’ তৃণমূল স্তরের কর্মীদের লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে ঋতব্রত বলেন, ‘‘কর্মীরা লড়বেন আর কোটি কোটি টাকা খরচ করে চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে স্টেটাস বাড়াবেন, এটা হয় না।’’ বিদ্রোহী ঋতব্রত যে কথা প্রকাশ্যে বলছেন, সেই কথাই ক্রমাগত জোরালো ভাবে শোনা যাচ্ছে এখনও যাঁরা মমতার সঙ্গে আছেন তাঁদের মুখেও। ক’দিন আগে অভিষেকের জীবনযাপনের বিলাস নিয়ে মুখ খুলেছিলেন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া সাংসদ শতাব্দী রায়। গত বেশ কয়েক বছর ধরেই একটি বেসরকারি সংস্থার প্রাইভেট জেট এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে মেঘালয় নির্বাচনে কলকাতার রাধাবাজারের ঠিকানায় নথিভুক্ত ওই সংস্থার বিমান চড়ার জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে তৃণমূল বিমান এবং হেলিকপ্টার বাবদ খরচ করেছিল ৪৬ কোটি টাকার বেশি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও প্রচারের সময় ওই সংস্থারই হেলিকপ্টার এবং বিমান ব্যবহার করেছিলেন অভিষেক। সূত্রের খবর, বছরের বাকি সময়ও ওই সংস্থার বিমান চড়েন অভিষেক। বিমানটি ব্রাজিলের এমব্রায়া সংস্থার তৈরি ইআরজে-১৩৫বিজে লিগাসি ৬০০ মডেলের বিমান। অভিষেক যেটিতে চড়েন সেটির ভিআইপি কনফিগারেশন রয়েছে। বিমান সংস্থাটির সঙ্গে বিমানের ভাড়া বা চুক্তি নিয়ে খোঁজ করার চেষ্টা করলে তাঁদের পক্ষ থেকে কোনও উত্তর মেলেনি।
তবে অন্যান্য বিমান সংস্থা যারা এই একই মডেলের প্রাইভেট জেট ভাড়া দেয়, তাদের কাছ থেকে জানা গিয়েছে, এই বিমানের ভাড়া ঘণ্টা প্রতি (ফ্লাইং আওয়ার) ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা। বিমানের ইঞ্জিন চালু হওয়া থেকে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইং আওয়ার বা উড়ান ঘণ্টা হিসাব করা হয়। এ ছাড়াও বিমান অপেক্ষার জন্য আলাদা ভাড়া নেওয়া হয়। যে বিমানবন্দর থেকে উড়ছে, সেখানে যদি সেই বিমানের হ্যাঙার না থাকে, তা হলে বিমান থাকার আলাদা খরচ বা বিমানের মূল হ্যাঙারে ফিরে যাওয়ার খরচও ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে এক বার দিল্লি যাতায়াতের খরচই যে বেশ কয়েক লক্ষ টাকা তা এই প্রাথমিক হিসাব থেকেই স্পষ্ট।
তৃণমূলের নেতা–নেত্রীদের বড় অংশের দাবি, এতদিনের স্ট্রাগল এবং বয়সের কথা বিবেচনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি চার্টার্ড ফ্লাইটে যাতায়াত করতেন, তা হলেও কিছু বলার ছিল না। কিন্তু, ৩৮ বছরের তরতাজা যুবক অভিষেক তো চাইলেই বিজ়নেস ক্লাসে দিল্লি যেতে পারেন। বিশেষত যখন দল কার্যত কোণঠাসা। প্রশ্ন উঠেছে, এমন তো নয়, তাঁকে প্রত্যন্ত কোনও শহরে দলের জরুরি কাজে যেতে হচ্ছে। যেখানে কলকাতা থেকে ডিরেক্ট ফ্লাইট নেই। সারা দিনে কলকাতা থেকে দিল্লির অনেক ফ্লাইট। কার্যত বিমানবন্দরে গিয়ে টিকিট কেটে ফ্লাইট ধরা যায়। তা না করে, যে ভাবে সাধারণ মানুষ গাড়ি ভাড়া করেন, সে ভাবে বিমান ভাড়া করে দিল্লি যাচ্ছেন তিনি।